আন্তর্জাতিক
রাজনীতি নিয়ে যারা পড়াশোনা করেন কিংবা চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের
কাছে "সানশাইন পলিসি" কিংবা "পিং পং ডিপ্লোমেসি"র মতো
শব্দগুলো নিশ্চয়ই পরিচিত। কিন্তু এই পরিভাষাগুলোর পেছনের আসল গল্পটা অনেক সময়ই
অস্পষ্ট থেকে যায় — কে কবে কী উদ্দেশ্যে এসব নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তার ফলাফলই বা
কী হয়েছিল।
আজকের লেখায়
বিশ্ব কূটনীতির এমন সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পলিসি ও ডকট্রিন নিয়ে আলোচনা করব, যেগুলো
বিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
সূচিপত্র
- সানশাইন পলিসি
- আয়রন কার্টেন
- গুজরাল ডকট্রিন
- গেম থিওরি বা ক্রীড়া কূটনীতি
- পেরেস্ত্রয়কা
- পিং পং ডিপ্লোমেসি
- ট্রুম্যান ডকট্রিন
১.
সানশাইন পলিসি: দুই কোরিয়ার মধ্যে বরফ গলার গল্প
দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া একে অপরের চিরশত্রু হিসেবে
পরিচিত। এই বৈরিতার মধ্যেই ১৯৯৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন
কিম দায়ে জং, আর তিনিই প্রবর্তন করেন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক
করার এক নতুন কৌশল — যার নাম দেওয়া হয় "সানশাইন পলিসি"। ইশপের
গল্প থেকে ধার করা এই নামকরণের পেছনের ভাবনাটা ছিল সহজ: জোর করে নয়, বরং উষ্ণতা ও
সহযোগিতা দিয়েই প্রতিপক্ষকে বদলানো সম্ভব।
পূর্ববর্তী
শাসকদের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে কিম দায়ে জং অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পারিবারিক
পুনর্মিলন কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পথ খোলেন। এই নীতিরই চূড়ান্ত পরিণতি
হিসেবে ২০০০ সালের ১৩ থেকে ১৫ জুন পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত হয় দুই কোরিয়ার
ইতিহাসের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন, যেখানে কিম দায়ে জং সাক্ষাৎ করেন উত্তর কোরিয়ার
নেতা কিম জং-ইলের সঙ্গে। এই সম্মেলনের স্বীকৃতিস্বরূপ কিম দায়ে জং পরে নোবেল
শান্তি পুরস্কারও লাভ করেন।
২.
আয়রন কার্টেন: তথ্যের ওপর লৌহযবনিকা
দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ইউরোপ ভাগ হয়ে যায় দুই মতাদর্শের ছায়ায় — পশ্চিমা
গণতান্ত্রিক বলয় আর সোভিয়েত-নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ইউরোপ। সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলো
তাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বহির্বিশ্বের কাছে অস্পষ্ট রাখতে সংবাদমাধ্যম, তথ্য
প্রবাহ ও বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াতের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
এই অদৃশ্য
বিভাজনরেখাকেই বোঝাতে "আয়রন কার্টেন" বা লৌহযবনিকা শব্দটি
ব্যবহার শুরু হয়, আর এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায় মূলত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
উইনস্টন চার্চিলের মাধ্যমে — ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফুলটনে দেওয়া তার বিখ্যাত
ভাষণে তিনি এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতির
কথা তুলে ধরেন। অর্থাৎ এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজের ঘোষিত কোনো নীতির নাম নয়,
বরং পশ্চিমা বিশ্ব থেকে তাদের এই আচরণকে চিহ্নিত করা একটি পরিভাষা। একই ধাঁচের
বিচ্ছিন্নতা নীতি চীনও অনুসরণ করেছিল, যাকে বলা হয় "ব্যাম্বু
কার্টেন"।
৩.
গুজরাল ডকট্রিন: ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের নতুন সূত্র
১৯৯৭ সালে
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন ইন্দর কুমার গুজরাল। প্রতিবেশী পাকিস্তানের
সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে তিনি যে কূটনৈতিক পথ বেছে নেন, তা পরবর্তীতে
পরিচিতি পায় "গুজরাল ডকট্রিন" নামে। তার আমলে প্রথমে সচিব ও
মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়, পরে তা গড়ায় দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠক
পর্যন্ত।
এই উদ্যোগের
একটি বাস্তব ফল হিসেবে ১৯৯৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি হটলাইন যোগাযোগ
চালু হয়, যা দুই দেশের মধ্যে সংকটকালীন ভুল বোঝাবুঝি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখে।
৪.
গেম থিওরি বা ক্রীড়া কূটনীতি: খেলার মাঠে সম্পর্কের বরফ গলানো
যখন দুই
শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগ কার্যত বন্ধ থাকে, তখন
খেলাধুলার মতো অ-রাজনৈতিক মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টাকেই বলা
হয় "গেম থিওরি" বা ক্রীড়া কূটনীতি।
এর বাস্তব
উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯৯৮-৯৯ সালে, যখন উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেই পাকিস্তান
ক্রিকেট দল ভারত সফরে যায়, যা দুই দেশের মধ্যে সাময়িক হলেও একটি ইতিবাচক আবহ
তৈরি করে। একইভাবে ১৯৯৯ সালে ইরানের ফুটবল দলের যুক্তরাষ্ট্র সফরও দুই দেশের
সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। খেলাধুলা এভাবেই মাঝেমধ্যে কূটনীতির এমন এক নীরব
মাধ্যম হয়ে ওঠে, যা প্রথাগত আলোচনার টেবিলে সম্ভব হয় না।
৫.
পেরেস্ত্রয়কা: সোভিয়েত অর্থনীতির খোলনলচে বদল
রুশ শব্দ
"পেরেস্ত্রয়কা"র অর্থ সংস্কার বা পুনর্গঠন। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি
সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ তার "গ্লাসনস্ত" বা স্বচ্ছতা
নীতির পাশাপাশি ঘোষণা করেন এই অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি। সাবেক কঠোর
সমাজতান্ত্রিক কাঠামো থেকে সরে এসে তিনি সোভিয়েত অর্থনীতিতে উদারীকরণের পথ খোলেন।
এর ফলে ১৯৮৭
সাল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট দেশগুলোতে নতুন
রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক হাওয়া বইতে শুরু করে — বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু হয়,
ব্যক্তিমালিকানা ও ধর্মচর্চার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, আর স্তালিন-যুগের কঠোর
সমালোচনা প্রকাশ্যে আসতে থাকে। এই ঢেউয়ের ধারাবাহিকতায়ই পূর্ব জার্মানি পশ্চিম
জার্মানির সঙ্গে একীভূত হয়, আর শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালে ভেঙে পড়ে গোটা সোভিয়েত
ইউনিয়ন, জন্ম নেয় ১৫টি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র।
৬.
পিং পং ডিপ্লোমেসি: টেবিল টেনিস যেভাবে বদলে দিল বিশ্ব রাজনীতি
১৯৭১ সালে
জাপানে অনুষ্ঠিত এক টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে চীনা ও মার্কিন খেলোয়াড়দের
মধ্যে অপ্রত্যাশিত এক সৌহার্দ্যপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি হয়, যার সূত্র ধরে চীন
যুক্তরাষ্ট্রের টেবিল টেনিস দলকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানায়। এই ঘটনাই ইতিহাসে
পরিচিতি পায় "পিং পং ডিপ্লোমেসি" নামে — যা তখনকার সম্পূর্ণ
বিচ্ছিন্ন দুই পরাশক্তির মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ করার এক নীরব সূচনা হিসেবে কাজ করে।
এর পরের
ঘটনাপ্রবাহ ছিল দ্রুত। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭১
সালে গোপনে বেইজিং সফর করেন, আর তার ঠিক এক বছর পর, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে
স্বয়ং প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ঐতিহাসিক চীন সফরে যান। এই সফরের মধ্য দিয়েই
দুই দশকের বেশি সময়ের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটে, যুক্তরাষ্ট্র
সমাজতান্ত্রিক চীনকে স্বীকৃতি দেয়, আর চীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী
সদস্যপদ লাভ করে — বিনিময়ে তাইওয়ানকে জাতিসংঘ থেকে বাদ পড়তে হয়।
৭.
ট্রুম্যান ডকট্রিন: স্নায়ুযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা
১৯৪৬ সাল থেকে
গ্রিসে রাজতন্ত্রপন্থী ও সাম্যবাদী গেরিলাদের মধ্যে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছিল।
দীর্ঘদিন গ্রিসের রাজতান্ত্রিক পক্ষকে সমর্থন জোগানো ব্রিটেন তাদের নিজস্ব
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আর এই ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চেয়ে বসে।
এই প্রেক্ষাপটে
১৯৪৭ সালের ১২ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান কংগ্রেসে ভাষণ
দিয়ে গ্রিস ও তুরস্কের জন্য ৪০০ মিলিয়ন ডলার সাহায্যের অনুরোধ জানান। কংগ্রেসে
দেওয়া তার সেই ভাষণেই তিনি ঘোষণা করেন, স্বাধীন জাতিগুলো যেন নিজেদের ভবিষ্যৎ
নিজেরাই গড়ে তুলতে পারে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা করা উচিত। এই নীতিই
ইতিহাসে "ট্রুম্যান ডকট্রিন" নামে পরিচিত, আর একে বিবেচনা করা
হয় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের এক আনুষ্ঠানিক
সূচনাবিন্দু হিসেবে — এর মধ্য দিয়েই ইউরোপীয় রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি
জড়িয়ে পড়ে।
শেষ
কথা
সানশাইন পলিসি
থেকে শুরু করে ট্রুম্যান ডকট্রিন পর্যন্ত — এই সাতটি পরিভাষাই আসলে একই সত্যের
ভিন্ন ভিন্ন প্রতিফলন: রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থ রক্ষায় কখনো কূটনৈতিক সংলাপ,
কখনো অর্থনৈতিক সংস্কার, আবার কখনো খেলার মাঠকে হাতিয়ার বানিয়েছে। বিসিএস বা
যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এই টার্মগুলো বারবার আসে — তাই শুধু
নাম মুখস্থ না করে পেছনের প্রেক্ষাপট বুঝে নিলে মনে রাখাটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

0 মন্তব্যসমূহ