আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি কিংবা বিশ্ব সংবাদ— যেদিকেই চোখ রাখি না কেন, একটি নাম বারবার সামনে আসে— জাতিসংঘ। কোনো দেশে যুদ্ধ বাধলে, কোথাও দুর্ভিক্ষ বা মানবিক সংকট দেখা দিলে, কিংবা দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে গোটা বিশ্ব তাকিয়ে থাকে এই সংস্থাটির দিকে। কিন্তু জাতিসংঘ আসলে কী, কীভাবে এটি কাজ করে এবং এতে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়— এসব প্রশ্নের উত্তর অনেকেরই সম্পূর্ণ জানা নেই।
![]() |
| AI-generated image from ChatGPT |
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও সংগঠন নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক সিরিজের প্রথম পর্বে আজ আমরা জানব জাতিসংঘের জন্মকথা, এর মূল উদ্দেশ্য, পরিচালনার মূলনীতি, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং এই মহান উদ্যোগে বাংলাদেশের গর্বের ভূমিকা নিয়ে।
📌 সূচিপত্র (Table of Contents)
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পটভূমি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়। লাখো মানুষের প্রাণহানি, শহরের পর শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এবং গোটা বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয়— এই যুদ্ধ বিশ্ববাসীকে এক কঠিন শিক্ষা দিয়ে যায়: ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে হলে জাতিগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতার একটি স্থায়ী মঞ্চ প্রয়োজন।
এই উপলব্ধি থেকেই ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে জাতিসংঘ (United Nations)। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করাই ছিল এই সংস্থা গঠনের মূল চালিকাশক্তি।
জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্য
জাতিসংঘ সনদে সংস্থাটির যে চারটি মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা হলো—
- আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা— যুদ্ধ ও সংঘাত প্রতিরোধে কাজ করা।
- জাতিসমূহের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা— পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি করা।
- আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধানে সহায়তা করা— অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক বিষয়ে সহযোগিতা এবং মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা।
- সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করা— উপরিউক্ত লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন জাতির প্রচেষ্টাকে একটি কেন্দ্রবিন্দুতে সমন্বিত করা।
সহজ কথায়, জাতিসংঘ কোনো একক দেশের সংস্থা নয়, বরং এটি বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি অভিন্ন মঞ্চ, যেখানে বিরোধ মেটানো হয় আলোচনার টেবিলে, রণক্ষেত্রে নয়।
জাতিসংঘ পরিচালনার মূলনীতিসমূহ
যেকোনো বড় সংস্থার মতো জাতিসংঘেরও রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট নীতিমালা, যার ভিত্তিতে এটি পরিচালিত হয়। এই মূলনীতিগুলো জাতিসংঘ সনদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে—
- সমান মর্যাদা: সকল সদস্য রাষ্ট্র সমান মর্যাদার অধিকারী, এবং যেকোনো শান্তিকামী রাষ্ট্র চাইলে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করতে পারে।
- দায়িত্বশীলতা: জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজ নিজ দায়িত্ব বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করতে হয়।
- বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ: কোনো সদস্য রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভয়ভীতি বা শক্তি প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করতে পারে না।
- শান্তিপূর্ণ সমাধান: বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার রক্ষার স্বার্থে সব সদস্য রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিতে বাধ্য।
- পূর্ণ সহযোগিতা: জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী গৃহীত যেকোনো সিদ্ধান্তে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা দিতে হয়।
- অ-সদস্য রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য: জাতিসংঘের সদস্য নয় এমন রাষ্ট্রও সংস্থার মূলনীতির পরিপন্থি কোনো কাজ করে বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত করতে পারে না।
- অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা: কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে জাতিসংঘ সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না।
এই সাতটি নীতির মূল ভিত্তি হলো— পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং বলপ্রয়োগের বদলে সংলাপকে প্রাধান্য দেওয়া।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন কীভাবে কাজ করে?
অনেকেই মনে করেন জাতিসংঘের নিজস্ব সেনাবাহিনী বা পুলিশ বাহিনী আছে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। জাতিসংঘের কোনো স্থায়ী সেনাবাহিনী নেই। যুদ্ধবিধ্বস্ত বা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘ সনদের ৪৩ ও ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গঠিত হয় অস্থায়ী শান্তিরক্ষা বাহিনী, যার সদস্য সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্র থেকে।
![]() |
| AI-generated image from ChatGPT |
নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই মিশনগুলো পরিচালিত হয়। শান্তিরক্ষা মিশন প্রেরণের মূল উদ্দেশ্যগুলো হলো—
- সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমন করা
- যুদ্ধবিরতি চুক্তি তদারকি ও কার্যকর করা
- অঞ্চলে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা
- বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও চুক্তি স্বাক্ষরে সহায়তা করা
সহজভাবে বললে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা সংঘাতের মাঝখানে নিরপেক্ষ অবস্থানে দাঁড়িয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন— অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার জন্য নয়, বরং সহিংসতা থামানো ও পুনর্গঠনে সহায়তা করার জন্য।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত এবং এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় গর্বের একটি বিষয়।
বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেয় ১৯৮৮ সালে, মাত্র ১৫ জন সেনাসদস্য নিয়ে। সেই ছোট্ট যাত্রা আজ পরিণত হয়েছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞে। ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী—
- বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৪৪টি মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে
- বিশ্বের ৪০টি দেশের ৫৪টি মিশনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করেছে
- বর্তমানে বাংলাদেশ ১০টি মিশনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে
- সেনা, নৌ, বিমান ও পুলিশ বাহিনী মিলিয়ে প্রায় ৬,৫৮২ জন বাংলাদেশি সদস্য জাতিসংঘ মিশনে কর্মরত ছিলেন
- সৈন্য প্রেরণকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয় (শীর্ষে রয়েছে ইথিওপিয়া)
এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হলো— পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরালিওনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশটি বাংলা ভাষাকে তাদের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছে। এটি শুধু একটি সম্মাননা নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার গৌরবের এক অনন্য স্বীকৃতি।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ: সবচেয়ে ক্ষমতাধর অঙ্গ
জাতিসংঘের ছয়টি মূল অঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council)। এটি গঠিত হয়েছে ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে। নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে জাতিসংঘ সনদের ২৪, ২৫, ২৮, ২৯, ৩০ এবং ৪০ থেকে ৫৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা
- শান্তিভঙ্গকারী রাষ্ট্র বা পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা
- প্রয়োজনে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা
- অনুসন্ধান পরিচালনা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া
- বিভিন্ন প্রশাসনিক ও নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যাবলি সম্পাদন করা
- প্রয়োজনে মিলিটারি স্টাফ কমিটি গঠন করা
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ও ভেটো ক্ষমতা
নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ৫টি রাষ্ট্র স্থায়ী সদস্য, এবং এই পাঁচটি দেশই একমাত্র ভেটো ক্ষমতার অধিকারী। এই দেশগুলো হলো—
| দেশ | অঞ্চল |
|---|---|
| যুক্তরাষ্ট্র | উত্তর আমেরিকা |
| যুক্তরাজ্য | ইউরোপ |
| রাশিয়া | ইউরোপ/এশিয়া |
| ফ্রান্স | ইউরোপ |
| চীন | এশিয়া |
ভেটো ক্ষমতার অর্থ হলো, এই পাঁচটি দেশের যেকোনো একটি চাইলে নিরাপত্তা পরিষদের যেকোনো সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারে, এমনকি বাকি ১৪টি সদস্য একমত হলেও। এই কারণেই আন্তর্জাতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে জাতিসংঘ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনাও রয়েছে।
শেষ কথা
জাতিসংঘ নিছক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা নয়— এটি বিশ্বমানবতার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নিয়েছিল। যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা আছে, তবু সংঘাত থামাতে, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে এবং আন্তর্জাতিক সংলাপের মঞ্চ তৈরিতে জাতিসংঘের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর এই বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদান আমাদের প্রত্যেকের জন্য গর্বের বিষয়।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও সংগঠন নিয়ে আমাদের এই সিরিজের পরবর্তী পর্বে আমরা জানব আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা সম্পর্কে। সিরিজটির সঙ্গে থাকতে চোখ রাখুন আমাদের ব্লগে।


0 মন্তব্যসমূহ