সূচিপত্র
- রক্তশূন্যতা কি?
- হিমোগ্লোবিন (Haemoglobin) কি?
- রক্তশূন্যতার কারণসমূহ:
- দেহের বৃদ্ধি এবং রক্তশূন্যতা
- কি কি খাবারে আয়রন বেশি থাকে?
- রক্তশূন্যতার লক্ষণসমূহ
- রক্তশূন্যতা নিরুপণের উপায়
- চিকিৎসা
রক্তশূন্যতা কি?
ইংরেজিতে আমরা যাকে 'অ্যানিমিয়া'
(Anaemia) বলি তাকেই বাংলায় রক্তশূন্যতা বলে। সংজ্ঞা আকারে বলতে গেলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের
গুণগত বা পরিমাণগত যে কোনো ধরনের অভাবকে রক্তশূন্যতা বলা হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের
ক্ষেত্রে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ যখন 14gm/dl-এর কম হবে (স্বাভাবিক মাত্রা
14-18gm/dl) এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে 11.5 gm/dl-এর নিচে হবে (স্বাভাবিক মাত্রা
11.5-16.5 gm/dl) তখন আমরা তাকে Anaemia বা রক্তশূন্যতা বলি। এ সংখ্যায় Iron
deficiency anaemia বা আয়রনের অভাবজনিত রক্তশূন্যতার ওপর আলোচনা করা হলো।
![]() |
| Image by George Ion from Pixabay |
হিমোগ্লোবিন (Haemoglobin) কি?
হিমোগ্লোবিন এক ধরনের যৌগিক রঞ্জক পদার্থ,
যা রক্তের লোহিত কণিকায় থাকে; ফলে রক্ত লাল দেখায়। এর প্রধান কাজ হলো দেহের প্রতিটি
কোষে অক্সিজেন (O₂) পৌঁছে দেয়া এবং কোষ থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂)
নিয়ে এসে ফুসফুসের মাধ্যমে বের করে দেয়া। এ প্রসঙ্গে হিমোগ্লাবিনের সাথে আয়রনের সম্পর্কটা
বলে নেয়া প্রয়োজন। হিম + গ্লোবিন- এই দুই মিলে তৈরি হয় হিমোগ্লোবিন। আবার প্রটোপরফাইরিন
(Protoporphyrin) এবং আয়রন মিলে হিম তৈরি হয়। অর্থাৎ আয়রনের অভাব হলে হিম তৈরি হবে
না এবং হিম তৈরি না হলে হিমোগ্লোবিন তৈরি হবে না। ফলশ্রুতিতে রক্তশূন্যতা দেখা দিবে।
রক্তশূন্যতার কারণসমূহ:
রক্তশূন্যতা প্রধানত তিনটি কারণে হয়ে
থাকে-
১. রক্তক্ষরণজনিত কারণ;
২. বদহজম বা Malabsorption;
৩. খাদ্যে আয়রনের অভাব।
দীর্ঘমেয়াদি রক্তক্ষরণই রক্তশূন্যতার
মূল কারণ। এই রক্তক্ষরণ বিভিন্ন ভাবে হতে পারে। যেমন- পেটের কৃমি যা ধীরে ধীরে শোষণের
মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রক্তঘাটতি ঘটায়, পেপটিক আলসার, পাকস্থলী বা অন্ত্রের ক্যান্সার,
ব্যথানাশক ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া স্বরূপ, পাইলস, Oesophageal Varices এবং মহিলাদের
ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাসিক হওয়া, গর্ভপাত ও প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ ইত্যাদি। অপরদিকে যারাদীর্ঘমেয়াদি
পেটের পীড়ায় ভোগেন এবং খাদ্যনালীর বিভিন্ন ধরনের অপারেশন কিংবা খাদ্যনালীর জন্মগত ত্রুটি
ইত্যাদিরজন্য বদহজম হতে পারে। স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণে সাধারণত আয়রনের অভাব হয় না। তবে
যারা নিরামিষভোজী তারাই আয়রনের অভাবে ভুগতে পারেন।
দেহের বৃদ্ধি এবং রক্তশূন্যতা :
একটি শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয় তখন তার দেহে ৪-৬ মাসের চাহিদা পরিমাণ আয়রন জমা থাকে। এরপর ধীরে ধীরে তার মধ্যে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে থাকে। সে জন্য চিকিৎসকরা ৪-৬ মাসের মধ্যে শিশুকে বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার দিতে বলেন। এরপর দেহের বৃদ্ধির সাথে সাথে আয়নের চাহিদাও বৃদ্ধি পায় এবং একজন পূর্ণাঙ্গ বয়সের পুরুষ ও মহিলার দৈনিক ১-১.৫ মিলিগ্রাম আয়রন প্রয়োজন হয়। তাছাড়া মহিলাদের ক্ষেত্রে মাসিক চলাকালীন, গর্ভাবস্থায়, প্রসবকালীন এবং বাচ্চা যতদিন বুকের দুধ খায়- এই বিশেষ কয়েকটি সময়ে দৈনিক ২-৫ মিলিগ্রাম আয়রন প্রয়োজন হয়। ফলে তখন স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়রন গ্রহণ করতে হয় (ঔষধ আকারে); অন্যথায় রক্তশূন্যতা দেখা দিবে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমরা দৈনিক যে খাবার গ্রহণ করি তাতে ১-১.৫ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে।
কি কি খাবারে আয়রন বেশি থাকে?
আমাদের এই ভূ-পৃষ্ঠের ৪ ভাগই আয়রন কিন্তু
তা সত্ত্বেও আমরা রক্তশূন্যতায় ভুগছি। এর কারণ ভূ-পৃষ্ঠের আয়রন হজমযোগ্য নয়, ফলে রক্তশূন্যতা
পূরণে তা আমাদের কোনো কাজে আসে না। যেসব খাবারে আয়রন সবচেয়ে বেশি পরিমাণ থাকে তার মধ্যে
উল্লেখযোগ্য হলো কলিজা, কচু, কলা, আপেল, ডিমের কুসুম, শাক ইত্যাদি।
রক্তশূন্যতার লক্ষণসমূহ :
রক্তশূন্যতায় শরীর ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে
বর্ণ ধারণ করে, সহজেই অবসাদগ্রস্ত লাগে, বুক ধরফর করে, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং সামান্য
কাজেই শরীর হাপিয়ে যায়। দেহে যে সমস্ত পরিবর্তনসমূহ দেখা দেয় তার মধ্যে জিহ্বা মশৃণ
হয়ে যায়, নখ ভঙ্গুর হয়ে যায় এবং খাবার গিলতে অসুবিধা (dysphagia) হতে পারে। এছাড়াও
পায়ে পানি আসতে পারে এবং খাদ্যভ্যাসেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে (যেমন চক, মাটি ইত্যাদি
পছন্দ করা)। এভাবে চলতে থাকলে হার্টের মারাত্মক ক্ষতি (Heart failure) হতে পারে।
রক্তশূন্যতা নিরুপণের উপায়:
প্রাথমিকভাবে রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার
মাধ্যমেই রক্তশূন্যতা আছে কি-না তা ধারণা করা যায়। পরবর্তীতে সঠিকভাবে নিরূপণের জন্য
(PBF, Iron Profile, Hb-electrophoresis, Bone marrow iron study ইত্যাদি পরীক্ষা করা
যেতে পারে ।
রক্তশূন্যতায় চিকিৎসা:
ওপরের আলোচনা থেকে সহজেই ধারণা করা যায়,
কারা রক্তশূন্যতায় বেশি বেশি আক্রান্ত হতে পারেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, আমাদের দেশের
অধিকাংশ মহিলাই রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। উল্লিখিত বিশেষ সময়গুলোতে মহিলারা যাতে রক্তশূন্যতায়
আক্রান্ত না হন সেজন্য প্রতিরোধক হিসেবে Folfetab ট্যাবলেট একটা করে দৈনিক দু বার অথবা
Feofol ক্যাপসেল একটা করে দৈনিক গ্রহণ করতে পারেন। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় শেষের ৩ মাস
এবং বাচ্চা জন্মের পরবর্তী ২ মাস আয়রন অবশ্যই খাওয়া উচিত। এছাড়াও মাসিকের ক্ষতিপূরণের
জন্য ৭ দিন আয়রন খাওয়া যেতে পারে। অবশ্য যারা জনানিন্ত্রণের বড়ি খেয়ে থাকেন তাদের জন্য
শেষের ৭টি আয়রন ট্যাবলেট থাকে। এছাড়া ছোটবড় প্রত্যেকেরই উচিত (বাসার কাজের লোকসহ) বছরে
অন্তত দুবার কৃমিনাশক ঔষধ সেবন করা। এ ক্ষেত্রে
ছোটদের বেলায় Delentin বা Meben সিরাপ এবং বড়দের বেলায় AlbenDS ট্যাবলেট সেব্য। আমাদেরকে
মনে রাখতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বাত, ব্যথ্যা রোগের জন্য Diclofen, Disprin,
Prednisolone ইত্যাদি ঔষধ খাওয়া ঠিক নয়। কারণ এগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় খাদ্যনালীর
রক্তক্ষরণসহ দেহের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ